ট্রেন টু পাকিস্তান রিভিউ ও বিশ্লেষণ: খুশবন্ত সিংয়ের দেশভাগের মর্মস্পর্শী উপন্যাস ও মানবতার গল্প

ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৯৪৭ সাল কেবল একটি সালমাত্র নয়, এটি একটি রক্তাক্ত ক্ষত, যার যন্ত্রণা আজও এই উপমহাদেশের বাতাসে কান পাতলে শোনা যায়। দেশভাগের এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ইতিহাস নিয়ে বহু সাহিত্য রচিত হয়েছে, কিন্তু খুশবন্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ উপন্যাসটি যেন সেই সময়ের এক জীবন্ত, স্পন্দিত ও রক্তাক্ত দলিল হয়ে আজও পাঠকের হৃদয়ে তীব্র হাহাকার জাগিয়ে তোলে। ইন্টারনেটের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা গতানুগতিক রিভিউগুলো যেখানে কেবল উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপ বা চরিত্র বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে এই উপন্যাসের আসল নির্যাস লুকিয়ে আছে এর গভীরে বহমান এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে—যেখানে মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় ধর্মান্ধতার বিষবাষ্প এবং শাশ্বত মানবিকতা। এই লেখাটি সেই গভীরতার এক অনুসন্ধান…

কিছু বই পড়া শেষ হলেও শেষ হয় না। লেখা শেষ হয় – পাতা বন্ধ হয়, কিন্তু গল্প শেষ হওয়ার পর ও গল্পের একটা আবেশ রয়ে যায় মনের ভেতর । খুশবন্ত সিংয়ের “ট্রেন টু পাকিস্তান” আমার কাছে তেমনই এক বই। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি আকারে বড় নয়, কিন্তু কলমের কালিতে যে ক্ষত চিহ্ন সে ধারণ করে, তার গভীরতা মাপা সমভব না। দেশভাগের ইতিহাস আমরা পড়েছি পাঠ্যবইয়ে, সাল-তারিখ আর চুক্তির বিষয়গুলো। কিন্তু সেই ইতিহাসের ভেতরে যে মানুষগুলো ছিল, যাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে, যাদের প্রতিবেশী একদিন শত্রু হয়ে গেছে, তাদের কথা পাঠ্যবইয়ে থাকে না। খুশবন্ত সিং সেই না-বলা কথাগুলোই বলেছেন, একটি ছোট্ট সীমান্ত-গ্রামের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনার ভেতর দিয়ে।

উপন্যাসের শুরুতেই আমরা পরিচিত হই ‘মানো মাজরা’ নামের এক ছোট্ট, অখ্যাত এবং শান্ত গ্রামের সাথে, যা মূলত তৎকালীন অখণ্ড ভারতবর্ষের এক ক্ষুদ্র অথচ নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সুতলেজ নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামটিতে শিখ, মুসলিম এবং হিন্দুদের সহাবস্থান যেন শতকের পর শতক ধরে চলে আসা এক প্রাকৃতিক নিয়ম। মানো মাজরার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং এর দৈনন্দিন জীবনের যে চিত্র খুশবন্ত সিং এঁকেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। এই গ্রামের মানুষের জীবন ঘড়ির কাঁটায় নয়, বরং ট্রেনের হুইসেলের শব্দে আবর্তিত হয়। সকালে মেইল ট্রেনের শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে, মসজিদের মুয়াজ্জিন আজান দেন, গুরুদ্বারে গ্রন্থী পাঠ শুরু করেন। দুপুরের ট্রেনের শব্দ তাদের বিশ্রামের জানান দেয় এবং রাতের ট্রেনের শব্দে তারা নিশ্চিন্তে নিদ্রায় যায়। ধর্ম এখানে কোনো বিভেদের প্রাচীর নয়, বরং একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর এক নীরব প্রতিশ্রুতি। পারিপার্শ্বিক এই শান্ত, স্নিগ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক পরিবেশের বর্ণনা লেখক এতোটা নিপুণভাবে দিয়েছেন যে, পাঠক অজান্তেই মানো মাজরার ধুলোমাখা পথ, নদীর তীরের হাওয়া এবং মানুষের সারল্যের সাথে একাত্ম হয়ে যান। কিন্তু এই প্রশান্তির আড়ালে যে এক ভয়ংকর ঝড় অপেক্ষা করছে, তা প্রথমদিকে কেউ আঁচও করতে পারেনি।

হঠাৎ করেই মানো মাজরার এই চিরচেনা ছন্দে পতন ঘটে। দেশভাগের খবর যখন এই প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছায়, তখনো গ্রামের মানুষ বুঝতে পারেনি ‘পাকিস্তান’ বা ‘হিন্দুস্তান’ নামক রাজনৈতিক বিভাজন তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কী প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু একদিন যখন একটি ট্রেন পাকিস্তানের দিক থেকে এসে থামে মানো মাজরার স্টেশনে, তখন সেই ট্রেনের কোনো হুইসেল ছিল না, ছিল না কোনো যাত্রীর কোলাহল। রাতের অন্ধকারে চুপিচুপি এসে থামা সেই ট্রেনটি ছিল লাশে ঠাসা—পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু ও শিখদের মৃতদেহ। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর এক দমবন্ধ করা দুর্গন্ধ। ঠিক এই মুহূর্তটি থেকে উপন্যাসের সুর পুরোপুরি বদলে যায়। পারিপার্শ্বিক সেই স্নিগ্ধ প্রকৃতি যেন মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। সুতলেজ নদীর যে জল একদিন গ্রামের মানুষের তৃষ্ণা মেটাতো, সেই নদীর জল ধীরে ধীরে লাল হতে শুরু করে। ভাসমান মৃতদেহ, গবাদি পশু এবং মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। লেখক এখানে অত্যন্ত নির্মমভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনকে নরকে পরিণত করে।

এই নরক যন্ত্রণার মাঝেই জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। যে মানো মাজরার মানুষরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একে অপরের উৎসবে অংশ নিয়েছে, বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তারা হঠাৎ করেই একে অপরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করে। ধর্মান্ধতা নামক এক ভয়ংকর ব্যাধি কীভাবে মানুষের মগজ ধোলাই করে, তার এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এখানে পাওয়া যায়। বাইরে থেকে আসা কিছু উগ্রবাদী যুবক যখন শিখদের বোঝাতে শুরু করে যে মুসলমানদের হত্যা করা তাদের পবিত্র দায়িত্ব, তখন গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর ভেতরেও এক আদিম হিংস্রতা জেগে ওঠে। খুশবন্ত সিং খুব সাহসিকতার সাথে দেখিয়েছেন যে, ধর্মান্ধতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের একক সম্পত্তি নয়; এটি এমন এক আগুন যা একবার জ্বলে উঠলে হিন্দু, মুসলিম, শিখ—সবাইকে সমানভাবে ভস্মীভূত করে। ধর্মের নামে মানুষ যখন অন্ধ হয়ে যায়, তখন তার কাছে শৈশবের বন্ধু, প্রতিবেশী বা মানবিক সম্পর্কের কোনো মূল্যই থাকে না। মানো মাজরার শিখ এবং মুসলিমদের মধ্যে যে অটুট বিশ্বাস ছিল, তা কয়েকদিনের ব্যবধানেই ধুলিসাৎ হয়ে যায়। সাম্প্রদায়িকতার এই বিষবাষ্প কীভাবে মানুষের বিবেককে পঙ্গু করে দেয়, তা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক কোনো রাখঢাক করেননি, বরং মানুষের নগ্ন এবং বীভৎস রূপটিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন এই বিশাল ক্যানভাসের একেকটি জ্বলন্ত বিন্দু। এখানে কেউ পুরোপুরি ভালো বা পুরোপুরি খারাপ নয়; সবাই পরিস্থিতির শিকার। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম চাঁদ চরিত্রটি প্রশাসনের এক বাস্তব প্রতিমূর্তি। সে দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাবাদী এবং মদ্যপ। কিন্তু তার ভেতরেও লুকিয়ে আছে এক অসহায় মানুষ, যে দেশভাগের এই বিশাল ট্র্যাজেডিকে আটকাতে অক্ষম। সে জানে যে সামনে এক বিশাল হত্যাযজ্ঞ হতে চলেছে, কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নিজের কাপুরুষতার কারণে সে কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে রয়েছে ইকবাল নামের এক শিক্ষিত, সমাজতান্ত্রিক এবং আদর্শবাদী যুবক, যে শহর থেকে এসেছে গ্রামে বিপ্লব আনতে। ইকবাল চরিত্রটির মধ্য দিয়ে লেখক তৎকালীন শিক্ষিত সমাজের এক দারুণ সমালোচনা করেছেন। ইকবালের কাছে সমাজ পরিবর্তনের অনেক তত্ত্ব আছে, সে চায় মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে। কিন্তু যখন সত্যিকারের মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্ত আসে, যখন চোখের সামনে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়, তখন ইকবালের সেই বইয়ের পাতার আদর্শ কোনো কাজেই আসে না। সে নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাত্ত্বিক যুক্তির আড়ালে নিজের কাপুরুষতাকে ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করে। খুশবন্ত সিং যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে, যখন ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতার মতো আদিম প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তখন ড্রয়িংরুমে বসে থাকা বুদ্ধিজীবীদের ফাঁকা বুলি কতটা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কিন্তু এই গভীর হতাশা, রক্তপাত এবং চারপাশের এই নারকীয় অন্ধকারের মাঝেই উপন্যাসটি প্রজ্জ্বলিত করে মানবিকতার এক আশ্চর্য আলো। আর এই আলোর মশালটি যার হাতে থাকে, সে সমাজের চোখে কোনো আদর্শ মানুষ নয়। সে হলো গ্রামের চিহ্নিত ডাকাত, বদমাশ এবং মদ্যপ যুবক—জগত সিং বা জুগ্গা। জুগ্গা কোনো শিক্ষিত মানুষ নয়, তার কাছে কোনো রাজনৈতিক বা দার্শনিক তত্ত্ব নেই। সে বারবার জেলে যায় এবং পুলিশের খাতায় সে একজন দাগী আসামি। কিন্তু এই জুগ্গার বুকেই লুকিয়ে আছে এক আদিম, অকৃত্রিম এবং নিখাদ ভালোবাসা। সে ভালোবাসে গ্রামের এক মুসলিম মেয়ে নূরাকে। নূরার গর্ভে জুগ্গার সন্তান। যখন মানো মাজরা থেকে মুসলিমদের জোরপূর্বক পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়, তখন উগ্রবাদী শিখরা পরিকল্পনা করে যে সেই ট্রেনে তারা হামলা চালাবে এবং একজন মুসলিমকেও জীবিত পাকিস্তানে পৌঁছাতে দেবে না। ট্রেনের যাত্রাপথে একটি ব্রিজের ওপর দড়ি বেঁধে রাখা হয়, যাতে ট্রেনের ছাদে বসে থাকা যাত্রীরা সেই দড়িতে আটকে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং এরপর শুরু হবে আসল হত্যাযজ্ঞ। হুকুম চাঁদ বা ইকবালের মতো ক্ষমতাবান বা শিক্ষিত মানুষেরা যখন এই আসন্ন গণহত্যার কথা জেনেও নিশ্চুপ হয়ে থাকে, তখন এগিয়ে আসে এই অশিক্ষিত, অমার্জিত ডাকাত জুগ্গা।

জুগ্গার এই এগিয়ে আসা কেবল তার প্রেমিকা নূরাকে বাঁচানোর জন্য ছিল না; এটি ছিল ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মানবিকতার এক চরম বিদ্রোহ। অন্ধকারের বুক চিরে যখন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ট্রেনটি এগিয়ে আসছিল, জুগ্গা তখন নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সেই ব্রিজের ওপর ওঠে। তার হাতে থাকা ছোট্ট কৃপাণ দিয়ে সে ট্রেনের পথে বাঁধা সেই মরণফাঁদ অর্থাৎ মোটা দড়িটি কাটার চেষ্টা করতে থাকে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তার নিজের ধর্মেরই উগ্রবাদীরা যখন বুঝতে পারে জুগ্গা তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিচ্ছে, তখন তারা জুগ্গাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে। কিন্তু জুগ্গা থামে না। তার শরীর বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যায়, রক্তে ভেসে যায় তার শরীর, কিন্তু জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে সে দড়িটি কেটে ফেলে। ট্রেনটি যখন তীব্র বেগে ব্রিজের ওপর দিয়ে হুস করে বেরিয়ে যায় হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে, তখন সেই ট্রেনের চাকায় পিষ্ট হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জুগ্গার নিথর দেহ।

জুগ্গার এই আত্মত্যাগ উপন্যাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী এবং শক্তিশালী অধ্যায়। এটি পাঠকের হৃদয়কে এমন এক প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়, যা সহজে ভোলার নয়। খুশবন্ত সিং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রশ্ন তুলেছেন—আসল ধার্মিক কে? আসল মানুষ কে? যে মানুষটি দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে বা নিয়ম করে গুরুদ্বারে যায় অথচ সুযোগ পেলেই অন্য ধর্মের মানুষের রক্তে হাত রাঙায়, সে? নাকি সমাজের চোখে ঘৃণিত সেই ডাকাত, যে নিজের জীবন দিয়ে হাজারো ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রাণ বাঁচায়? জুগ্গা প্রমাণ করে দেয় যে, মানবিকতা কোনো বইয়ের পাতায় শেখা বিদ্যার ওপর নির্ভর করে না; এটি মানুষের অন্তরের এক শাশ্বত আলো, যা শত অন্ধকারের মাঝেও ঠিকই পথ খুঁজে নেয়।

আমার কাছে এই উপন্যাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক হলো এর ভাষার সংযম। খুশবন্ত সিং কোথাও পাঠককে কাঁদতে বাধ্য করেননি। তিনি কোনো পক্ষ নেননি, হিন্দু-মুসলমান-শিখ, কাউকেই নিখুঁত দেবতা বা নিখাদ দানব করে আঁকেননি। প্রতিটি সম্প্রদায়ের ভেতরে ভালো মানুষ আছে, নিষ্ঠুর মানুষও আছে। এই ভারসাম্যই উপন্যাসটিকে সময়ের উর্ধ্বে তুলে দিয়েছে। কারণ ঘৃণার কোনো ধর্ম নেই, নৃশংসতার কোনো একক ঠিকানা নেই। দুই পক্ষই ট্রেনে লাশ পাঠিয়েছে, দুই পক্ষই কাঁদছে নিজেদের মৃতদের জন্য। আর এই যন্ত্রণার সমতা দেখাতে গিয়ে লেখক আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেন, দেশভাগে কেউ জেতেনি, সবাই হেরেছে।

‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ কেবল একটি দেশভাগের গল্প নয়; এটি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির চাপে মানুষের বদলে যাওয়ার গল্প, ধর্মান্ধতার বিষবাষ্পে একটি সুস্থ সমাজের পচে যাওয়ার গল্প এবং সর্বোপরি সমস্ত ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানবিকতার জেগে ওঠার গল্প। লেখক এখানে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নেননি। তিনি কেবল একজন পর্যবেক্ষকের মতো মানুষের ভেতরের পশু এবং দেবতার লড়াইটিকে শব্দে শব্দে গেঁথেছেন। উপন্যাসের ভাষা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, বর্ণনাগুলো চিত্ররূপময় এবং আবেগগুলো জীবন্ত।। এই বইটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সাম্প্রদায়িকতা নামক ব্যাধিটি চিরকালই সমাজের গভীরে সুপ্ত থাকে, সুযোগ পেলেই তা মহামারী আকার ধারণ করে। কিন্তু একই সাথে বইটি আমাদের এই আশাও দেয় যে, যত দিন পৃথিবীতে জুগ্গার মতো নিঃস্বার্থ প্রেমের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন মানবিকতা কখনোই পুরোপুরি পরাস্ত হবে না। দেশভাগ হাজার হাজার মানুষকে তাদের শিকড় থেকে ছিন্ন করেছিল, তৈরি করেছিল অগণিত সীমানা; কিন্তু খুশবন্ত সিংয়ের এই অমর সৃষ্টি প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আত্মত্যাগ এবং মানবিক অনুভূতির কোনো সীমানা হয় না। এই উপন্যাসটি পড়ে শেষ করার পর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা এবং একই সাথে এক গভীর প্রশান্তি কাজ করে—এই ভেবে যে, চরম অমানবিকতার মাঝেও মানুষের মানবিক রূপটিই দিনশেষে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সত্য।